ইতিকাফ কি ও তার গুরুত্ব আলোচনা

 প্রশ্নঃ

ইতিকাফ বলতে কী বুঝায় বা এর পরিচয় কী?

উত্তরঃ
পবিত্র রমজান মাসে বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে এতেকাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ‘ইতিকাফ’ একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ অবস্থান করা, স্থির থাকা, কোনো স্থানে আটকে পড়া বা আবদ্ধ হয়ে থাকা।

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, রমজান মাসের শেষ দশক বা অন্য কোনো দিন জাগতিক কাজকর্ম ও পরিবার-পরিজন থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহকে রাজি খুশি করার নিয়তে পুরুষের জন্য মসজিদে বা নারীদের ঘরে নামাজের নির্দিষ্ট একটি স্থানে ইবাদত করার উদ্দেশ্যে অবস্থান করা ও স্থির থাকাকে ইতিকাফ বলে। 

কোরআন-হাদিসে ইতিকাফ প্রসঙ্গঃ

 পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা : ১৮৭নং আয়াতে ইরশাদ করেছেন, আর তোমরা মসজিদে এতেকাফ কালে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করো না নবীজি ইতিকাফকে খুব গুরুত্ব দিতেন।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানের শেষ দশক (মসজিদে) ইতিকাফ করতেন। এ আমল তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত কায়েম ছিল।’
(বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্নঃ
ইতিকাফ কত প্রকার?

উত্তরঃ
ইতিকাফের প্রকারভেদ :ইতিকাফ ৩প্রকার।

১)সুন্নত ইতিকাফ : 
রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের ইতিকাফ সুন্নতে মোয়াক্কাদা আলাল কেফায়া। অর্থাৎ মহল্লার যে কোনো একজন ইতিকাফ করলে পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে ইতিকাফ আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু মহল্লার একজন ব্যক্তিও যদি ইতিকাফ না করে তবে মহল্লার সবার সুন্নত পরিত্যাগের গোনাহ হবে।
(দুররে মুখতার: ২/৪৪০)
২১ তারিখের রাত থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত এই ইতিকাফের সময়। কারণ রাসুল (সা.) প্রত্যেক বছর এই দিনগুলোতেই ইতিকাফ করতেন। এ কারণে এটাকে সুন্নত ইতিকাফ বলা হয়।

২)ওয়াজিব ইতিকাফ :
মান্নতের ইতিকাফ ওয়াজিব। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা যেন তাদের মানৎ পূর্ণ করে।’
(সূরা হজ: ২৯)
তাতে কোনো শর্ত থাকুক বা না থাকুক। যেমন- কেউ বললো, ‘আমার এই কাজ সমাধা হলে আমি ইতিকাফ করবো’, এতে যেমন ইতিকাফ ওয়াজিব হবে ঠিক তেমনই কেউ যদি বলে- ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইতিকাফ করবো’, এ অবস্থাতেও ইতিকাফ করা ওয়াজিব বলে সাব্যস্ত হবে।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২১৩, দুররে মুখতার: ২/৪৪১)
সুন্নাত ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে গেলে তা কাজা করা ওয়াজিব।

৩)নফল ইতিকাফ :
উপরোক্ত দুই প্রকার ইতিকাফ ছাড়া বাকি সব ইতিকাফ নফল। এ ইতিকাফ মানুষ যেকোনো সময় করতে পারে। অর্থাৎ কিছু সময়ের জন্য ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যতক্ষণ চায় করতে পারে। রোজারও প্রয়োজন নেই। এমনকি যখনই মসজিদে প্রবেশ করবে নফল ইতিকাফের নিয়ত করা সুন্নত। 

প্রশ্নঃ
সর্বোত্তম ইতিকাফ কোনটি?

উত্তরঃ
ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান মসজিদুল হারাম, এরপর মসজিদে নববী, এরপর মসজিদে আকসা। এরপর জুম‘আ মসজিদ, এরপর যে মসজিদে বেশি মুসল্লি সালাত আদায় করে থাকে। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেন, ইতিকাফ সহীহ হবে এমন মসজিদে যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় করা হয়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেনো মসজিদে হারামে ইতিকাফ আদায় করে। এটি সওয়াবের ও জামাআতের দিক থেকে সর্বোত্তম। উৎকৃষ্ট ইতেকাফ হলো- কোনো জামে মসজিদে ইতিকাফ করা যেখানে রীতিমতো জামায়াতে নামায হয়। এরপর মহল্লার মসজিদে। 

প্রশ্নঃ
ইতিকাফের গুরুত্ব কি?

উত্তরঃ
ইতিকাফের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: 
জাগতিক সমস্ত কার্যকলাপ থেকে মুক্ত হয়ে একজন মানুষ কেবলই আল্লাহর উপাসনায় মগ্ন থাকেন। কোনধরনের গুনাহ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। মুক্ত থাকেন তিনি অশ্লীল ও ফাহেশাপূর্ণ কথাবার্তা থেকে। তার চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও ভাবনাগ্রস্ত শুধুই মহান রাব্বুল আলামিনকে ঘিরে। তাই অতিদ্রুত তার সঙ্গে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হতে থাকে। আল্লাহ তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতিকাফকারী সম্পর্কে বলেছেন যে, ইতিকাফকারী ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে বাইরে থেকে সকল নেক কাজ করে, গুনাহ হতে বেঁচে থাকে তার জন্য নেকী লেখা হয়।
(মিশকাত: ২১০৮)।
রাসুল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজানের শেষ দশকে অধিক পরিমাণে ইবাদত করতেন।
হজরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমজানের শেষ দশক শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাসুল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারা রাত জেগে থাকতেন ও নিজ পরিবারের সদস্যদের ঘুম থেকে জাগাতেন এবং তিনি নিজেও ইবাদতের জন্য জোর প্রস্তুতি নিতেন।
(মুসলিম: ২৬৫৮)
আর তা সম্ভব হয় ইতিকাফের মাধ্যমে।
রাসুল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রিয়নবী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন।
(মুসলিম: ২৬৫১)।

প্রশ্নঃ
ইতিকাফের মুস্তাহাবসমূহ কি কি??

উত্তরঃ
ইতিকাফে মুস্তাহাব বিষয়গুলো : কল্যাণকর কথা ছাড়া বাজে কথা না বলা। তবে নীরবে সময় কাটা মাকরুহ।
কুরআন তেলাওয়াত, মাসনুন জিকির, প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর দরুদ পড়া, ওয়াজ নসিহত করা এবং ধর্মীয় বই পুস্তক অধ্যয়ন ও রচনায় লিপ্ত থাকা।

প্রশ্নঃ
ইতিকাফে বর্জনীয় কাজ কি?

উত্তরঃ
ইতিকাফে বর্জনীয় বিষয়গুলো :
ইতিকাফ অবস্থায় চুপ থাকলে ছওয়াব হয় এই মনে করে চুপ থাকা মাকরূহ তাহরীমী। বিনা জরুরতে দুনিয়াবী কাজে লিপ্ত হওয়া মাকরূহ তাহরীমী। যেমন, ক্রয়-বিক্রয় করা ইত্যাদি।
তবে নেহায়েত জরুরত হলে যেমন ঘরে খোরাকী নেই এবং সে ব্যতীত কোন বিশ্বস্ত লোকও নেই এরূপ অবস্থায় মসজিদে মাল-পত্র উপস্থিত না করে কেনা বেচার চুক্তি করতে পারে।

হজরত আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ইতিকাফকারীর জন্য এ নিয়ম পালন করা জরুরীঃ

১. সে যেন কোন রোগী দেখতে না যায়।

২. কোন জানাযায় শারীক না হয়।

৩. স্ত্রী সহবাস না করে।

৪. স্ত্রীর সাথে ঘেঁষাঘেষি না করে।

৫. প্রয়োজন ছাড়া কোন কাজে বের না হয়।

৬. সওম ছাড়া ইতিকাফ না করে এবং

৭. জামে মাসজিদ ছাড়া যেন অন্য কোথাও ইতিকাফে না বসে।
(মিশকাত: ২১০৬)

প্রশ্নঃ
কি কি কাজ বৈধ ইতিকাফের সময়?

উত্তরঃ
ইতিকাফের মধ্যে যেসব কাজ করা জায়েজ(বৈধ) বা করা যাবে-

১. পেশাব পায়খানার জন্যে বাইরে যাওয়া জায়েয। মনে রাখতে হবে এসব প্রয়োজন এমন স্থানে পূরণ করতে হবে যা মসজিদের নিকটে হয়।

২. ফরয গোসলের জন্যেও এতেকাফের স্থান থেকে বাইরে যাওয়া জায়েয। তবে মসজিদেই গোসল করার ব্যবস্থা থাকলে সেখানেই গোসল করতে হবে।
৩. খানা খাওয়ার জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়া যায় যদি খানা নিয়ে আসর কোনো লোক না থাকে। খানা আনার লোক থাকলে মসজিদে খাওয়াই জরুরী।

৪. জুমা ও ঈদের নামাযের জন্যেও বাইরে যাওয়া জায়েয।

৫. যদি কোথাও আগুন লাগে, অথবা কেউ পানিতে পড়ে ডুবে যাচ্ছে অথবা কেউ কাউকে মেরে ফেলছে অথবা মসজিদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয় তাহলে এসব অবস্থায় এতেকাফের স্থান থেকে বাইরে যাওয়া শুধু জায়েযই নয় বরঞ্চ জরুরী।

৬. জুমার নামায আদায়ের জন্য বা কোনো জরুরত পুরণ করার জন্যে বের হলো এবং এ সময়ে সে কোনো রোগীর সেবা করলো অথবা জানাযায় শরীক হলো তাহলে তাতে কোনো দোষ হবে না।

৭. যে কোনো প্রাকৃতিক অথবা শরীয়াতের প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয।

৮. যদি কেনাবেচার কোনো লোক না থাকে এবং বাড়ীতে খাবার কিছু না থাকে তাহলে প্রয়োজনমত কেনাবেচা করা এতেকাফকারীর জায়েয।

৯. আযান দেয়ার জন্যে মসজিদের বাইরে যাওয়া জায়েয।

১০. এতেকাফ অবস্থায় কাউকে দীন সম্পর্কে পরামর্শ অথবা চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ দেয়া জায়েয। বিয়ে করা, ঘুমানো এবং আরাম করা জায়েয।

প্রশ্নঃ
কি কি কাজ অবৈধ ইতিকাফে?

উত্তরঃ
ইতিকাফে যেসব কাজ করা না জায়েজ বা অবৈধ-

১. এতেকাফ অবস্থায় যৌনক্রিয়া করা এবং স্ত্রীকে আলিঙ্গন করা হলে এতেকাফ নষ্ট হবে।

২. এতেকাফ অবস্থায় কোনো দুনিয়ার কাজে লিপ্ত হওয়া মাকরূহ তাহরিমী। বাধ্য হয়ে করলে জায়েয হবে।

৩. এতেকাফ অবস্থায় একেবারে চুপচাপ বসে থাকা মাকরূহ তাহরিমী। যিকির ফিকির, তেলাওয়াত প্রভৃতিতে লিপ্ত থাকা উচিত।

৪. মসজিদে বেচাকেনা করা। লড়াই-ঝগড়া করা, গীবত করা অথবা কোনো প্রকার বেহুদা কথা বরা মাকরূহ।

৫. কোনো প্রাকৃতিক ও শরয়ী প্রয়োজন ব্যতিরেকে মসজিদের বাইরে যাওয়া অথবা প্রাকৃতিক ও শরয়ী প্রয়োজনে বাইরে গিয়ে সেখানেই থেকে যাওয়া জায়েয নয়। তাতে এতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।



ইতিকাফ কি ও তার গুরুত্ব আলোচনা ইতিকাফ কি ও তার গুরুত্ব আলোচনা Reviewed by মইনীয়া যুব ফোরাম on 9:19 AM Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.